বিজয় বাইন ভোলা প্রকাশঃ
বিদ্যার দেবী শ্রী শ্রী সরস্বতী পূজা আগামীকাল (২৩ জানুয়ারি)। হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম এই ধর্মীয় উৎসবে পঞ্চমী তিথিতে বিদ্যা ও জ্ঞানের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সরস্বতীর চরণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবেন অগণিত ভক্ত। অজ্ঞতার অন্ধকার দূর করতে কল্যাণময়ী দেবীর চরণে প্রণতি জানাবেন তারা।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মতে, দেবী সরস্বতী সত্য, ন্যায় ও জ্ঞানালোকের প্রতীক। তিনি বিদ্যা, বাণী ও সুরের অধিষ্ঠাত্রী।
সরস্বতী মহাভাগে বিদ্যে কমললোচনে,
বিশ্বরূপে বিশালাক্ষী বিদ্যাং দেহি নমোহস্তুতে’—
এই মন্ত্র উচ্চারণ করে বিদ্যা ও জ্ঞান অর্জনের জন্য সনাতন ধর্মাবলম্বীরা দেবী সরস্বতীর অর্চনা করবেন।সরস্বতী পূজা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা, আগামীকাল বাণী অর্চনাসহ নানা ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে।পুষ্পাঞ্জলি প্রদান, প্রসাদ বিতরণ, ধর্মীয় আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সন্ধ্যা আরতি ও আলোকসজ্জাসহ নানা আয়োজন থাকবে।
কিভাবে জড় জগতে সরস্বতী দেবীর আবির্ভাব হয়েছিল?পঞ্চমবেদ রুপে প্রসিদ্ধ অষ্টাদশ মহা পুরাণের মধ্যে ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ শাস্ত্রের প্রকৃতিখন্ডে কেন বিষ্ণুপত্নী মূল সরস্বতী তাঁর অংশরুপে বিনাশশীল এ জড় জগতে ব্রহ্মার পত্নী এবং নদীরুপে আবির্ভূূত হয়েছিলেন তার স্পষ্ট বর্ণনা প্রদান করা হয়েছে। নিম্নে এ বিষয়ে আলোচনা করা হল-
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, প্রকৃতিখন্ড ৬/১২- ৫৩ শ্লোকের
বর্ণনা অনুযায়ী, চিন্ময় জগতের বৈকুণ্ঠে পরমেশ্বর শ্রীবিষ্ণুর তিন পত্নি-লক্ষ্মী,সরস্বতী এবং গঙ্গা সর্বদা প্রভু নারায়নের প্রেমময়ী সেবায় যুক্ত। একবার বৈকুন্ঠ জগতে গঙ্গা এবং সরস্বতীর মাঝে মনোমালিন্য হয়। তাতে গঙ্গা সরস্বতী দেবীকে পৃথিবীতে নদীরূপে পতিত হওয়ার জন্য অভিশাপ প্রদান করেন। আর সরস্বতী দেবীও গঙ্গাকে অভিশাপ প্রদান করেন এই বলে যে, সে যেন নদীরুপে পৃথিবীতে পতিত হয়ে পাপীদের পাপ গ্রহণ করে।সে সময় ভগবান শ্রীবিষ্ণু সেখানে এসে উপস্থিত হন এবং সমস্ত ঘটনা শ্রবণ করে দুঃখ প্রকাশ করে গঙ্গা এবং সরস্বতীকে বলেন-
গঙ্গে যাস্যসি পশ্চাৎ ত্বমংশেন বিশ্বপাবনী।
ভারতং ভারতীশাপাৎ পাপদাহায় দেহিনাম্ ॥৪৯।।
ভগীরথস্য তপসা তেন নীতা সুদুষ্করাৎ।
নায়া ভাগীরথী পুতা ভবিষ্যসি মহীতলে ॥ ৫০।।
মদংশস্য সমুদ্রস্য জায়া জায়ে মমাজ্ঞয়া।
মৎকলাংশস্য ভূপস্য শান্তনোশ্চ সুরেশ্বরি॥ ৫১।।
– (ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণঃ প্রকৃতিখন্ড ৬/৪৯-৫১)
অনুবাদঃ হে গঙ্গে। তুমি সরস্বতীর অভিশাপ বশতঃ তোমার অংশরূপে বিশ্বপাবনী হয়ে শরীরী জীবের পাপরাশি ভস্মসাৎ করার নিমিত্তে ভারতে অবতীর্ণ হবে। ভগীরথ কঠোর তপস্যা দ্বারা তোমাকে পৃথিবীতে অবতীর্ণ করাবে। সেই জন্য তোমার নাম ভাগীরথী নামে ভূমণ্ডলে বিখ্যাত হবে। হে প্রিয়ে সুরেশ্বরি! তুমি আমার আজ্ঞানুসারে ভূতলে গমন করে আমার অংশভূত সমুদ্রের এবং অংশের অংশ-সম্ভূত শান্তনুরাজার সহধর্মিণী হয়ে কিছুকাল অবস্থান কর।
গঙ্গাশাপেন কলয়া ভারতং গচ্ছ ভারতি।
কলহস্য ফলং ভুঙৃক্ষ্ব সপত্নীভ্যাং সহাচ্যুতে ॥ ৫২।।
স্বয়ঞ্চ ব্রহ্মসদনং ব্রহ্মণঃ কামিনী ভব।৫৩
- (ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণঃ প্রকৃতিখন্ড ৬/৫২-৫৩)
অনুবাদঃ হে সরস্বতী ! তুমিও গঙ্গার অভিশাপ বশতঃ নদীরুপে ধরাতে গমন কর।এবং তোমার অংশরূপে সপত্নীসহ কলহের ফলভোগ কর। স্বয়ং ব্রহ্মার সমীপে গমন করে তাঁহার সহধর্মিণী হও।”
এরপর গঙ্গার অভিশাপে সরস্বতী তাঁর একটি অংশরুপে পৃথিবীতে সরস্বতী নদীরুপে আবির্ভূত হন এবং অপর অংশে নারায়নের ইচ্ছায় ব্রহ্মার পত্নীরুপে বৈদিক শাস্ত্রসমূহের রক্ষা ও সৃষ্টিকার্যে ব্রহ্মাকে সাহায্য কল্পে ব্রহ্মার মুখ থেকে তাঁর পত্নিরুপে আবির্ভূত হন।