জমি নিয়ে বিরোধের জেরে হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, পাল্টা মামলা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের অভিযোগ তুলে নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন মোহাম্মদ রাশেদুল ইসলাম রাশেদ নামের এক স্কুলশিক্ষক।
রাশেদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তার পরিবারের ভোগদখলে থাকা জমিকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত। এ বিরোধের জেরে কয়েক দফায় তাকে ও তার ভাইকে মারধর করা হয়েছে। এমনকি তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ করেছেন তিনি।
রাশেদ জানান, তার মা মৃত সাহানুর বেগম ও ছোট মামা মো. জাহাঙ্গীরের কাছে তাদের বড় ভাই শফিকুল ইসলাম ২০০০ সালে গ্রামের জমির একটি অংশ মৌখিকভাবে বিক্রি করে দখল বুঝিয়ে দেন। এরপর থেকে ২৪৬১ খতিয়ানের ৯০৬৬ দাগের জমি তারা ভোগদখল করে আসছেন বলে দাবি তার।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশেদের মা মারা যাওয়ার পর ২০২৩ সালের ১৮ আগস্ট ওই জমিতে ঘর নির্মাণ ও গাছপালা কাটাকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত হয় বলে তিনি জানান। স্থানীয় জনপ্রতিনিধির উপস্থিতিতে বিষয়টি মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হলেও পরবর্তীতে জমি হস্তান্তর নিয়ে নতুন করে বিরোধ তৈরি হয়।
রাশেদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৪ জানুয়ারি রাত পৌনে ১২টার দিকে ফারুক ও তার ছেলে সজীবসহ কয়েকজন লোক তার ভোগদখলীয় জমিতে গিয়ে তাকে মারধর করেন। এতে তার মাথা ফেটে যায় এবং ১০টি সেলাই দিতে হয়। একই ঘটনায় তার ছোট ভাই সোলাইমানের আঙুল ভেঙে যায় বলেও দাবি করেন তিনি।
ঘটনার পর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে ২৬ জানুয়ারি থানায় মামলা করেন রাশেদ। তার দাবি, মামলার পর আসামি ফারুককে পুলিশ আটক করে। পরে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি বিষয়টি সালিশের মাধ্যমে সমাধানের আশ্বাস দিলে তিনি আদালত থেকে ফারুকের জামিন করিয়ে আনেন।
রাশেদের অভিযোগ, পরবর্তীতে সালিশের নামে সময়ক্ষেপণের সুযোগ নিয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ১১৩৭ নম্বর দলিলের মাধ্যমে তার মামির কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট জমি ফারুক কিনে নেন। এরপর বিরোধ আরও জটিল হয়ে ওঠে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, মামলা প্রত্যাহার ও আর্থিক সুবিধা দেওয়ার জন্য তাকে চাপ দেওয়া হয়। এতে রাজি না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা ও হামলার হুমকি দেওয়া হয়। পরে ৩০ এপ্রিল তার বিরুদ্ধে সি.আর. মামলা নং ৬৬৫/২০২৬ দায়ের করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
এরপর ২৮ মে ঈদের দিন কয়েকজনের সামনে ফারুকের দুই ছেলে ইসমাইল ও সজীব তাকে মারধর করে কানের পর্দা ফাটিয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেন রাশেদ। ৩০ মে চিকিৎসকের পরীক্ষায় তার বাম কানের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি ধরা পড়ে বলে দাবি তার। এ ঘটনায় থানায় জিডি করেন তিনি, যার নম্বর ১৭২৩ বলে জানান।
রাশেদের আরও অভিযোগ, পরবর্তী সময়ে তাকে বাড়ির বাইরে বের হওয়ার জন্য ডেকে ভয় দেখানো হয় এবং একপর্যায়ে তার মোটরসাইকেলেও আঘাত করা হয়। নিরাপত্তার জন্য তিনি আদালতে সি.আর. মামলা নং ৭৯৭/২০২৬ দায়ের করেন। মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশের একজন তদন্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
নিরাপত্তাহীনতার কথা উল্লেখ করে রাশেদ বলেন, ২৬ জুন তদন্ত কর্মকর্তা এলাকায় গেলে তিনি আতঙ্কে ভোলা শহরে চলে যান এবং এরপর থেকে নিজ বাড়িতে নিয়মিত অবস্থান করছেন না।
এদিকে ২৯ জুন রাতে তিনি ভোলায় অবস্থানকালে তার বিরুদ্ধে গরুর ঘরে আগুন দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয় বলে দাবি করেন রাশেদ। তার ভাষ্য, ঘটনার সময় তিনি ভোলায় ছিলেন এবং বিষয়টি জানতে পেরে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ফোনে জানান। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়ে বিষয়টি তদন্ত করে বলে দাবি তার।
রাশেদের অভিযোগ, এরপর ১ জুলাই তার বিরুদ্ধে বসতঘরে আগুন দেওয়ার অভিযোগে আদালতে মামলা করা হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে অপপ্রচার চালানো হয়।
তিনি বলেন, “আমি ২০১৫ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীদের পড়িয়েছি। ২০২৫ সালে ১৮তম নিবন্ধনের মাধ্যমে একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে গণিত শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। এলাকায় কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত বিরোধে জড়ানোর ইতিহাস আমার নেই। জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে আমাকে সামাজিকভাবে হেয় ও চাকরিজীবনে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে।”
রাশেদের দাবি, ফারুকের পরিবারের সঙ্গে তার সরাসরি কোনো জমি কেনাবেচার সম্পর্ক নেই। তার মামির সঙ্গে ফারুকের জমি কেনাবেচার বিষয়টি আলাদা হলেও সেই বিরোধের জেরে তাকে কেন বারবার হামলা ও হুমকির মুখে পড়তে হচ্ছে—এ প্রশ্নের উত্তর চান তিনি।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, ফারুকের বড় ছেলে ইসমাইল তাকে তার স্কুলের চাকরি নিয়ে হুমকি দিয়েছেন। এ ঘটনায় নিজের নিরাপত্তা এবং পেশাগত মর্যাদা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাশেদ।
এদিকে ৬ আগস্ট ফারুকের দুই ছেলে গোপনে আগাম জামিন নিতে আদালতে গেলে আদালত জামিন বাতিল করে তাদের আটক করার নির্দেশ দিয়েছে বলে দাবি করেছেন রাশেদ। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট আদালত বা পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এই প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
রাশেদ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সংগঠন, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন।
তার দাবি, তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরের কল ডিটেইল রেকর্ড (CDR), কললিস্ট ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত তথ্য যাচাই করা হলে বিভিন্ন ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটন সম্ভব হতে পারে।
তিনি বলেন, “আমি দেশের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমি কোনো অন্যায় সুবিধা চাই না। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত হোক এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক—এটাই আমার দাবি।”
তবে রাশেদের উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে অভিযুক্ত ফারুক, তার দুই ছেলে, সংশ্লিষ্ট আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য এই প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং উভয় পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী শিক্ষক।
প্রতিবেদকের মন্তব্য: জমি সংক্রান্ত বিরোধ, একাধিক মামলা, পাল্টা অভিযোগ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বক্তব্য—সব মিলিয়ে ঘটনাটি জটিল আকার ধারণ করেছে। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে দলিলপত্র, জমির দখল ও মালিকানার ইতিহাস, চিকিৎসা নথি, মামলা ও জিডির কাগজপত্র, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট সিসিটিভি/প্রযুক্তিগত তথ্য যাচাই করা জরুরি।