—- মোঃ মহিউদ্দিন
বাংলার প্রতিটি অঞ্চলের নিজস্ব কিছু সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও খাদ্যাভ্যাস রয়েছে, যা সময়ের প্রবাহে কখনো টিকে থাকে, আবার কখনো হারিয়ে যায়। ভোলা জেলার গ্রামবাংলার একসময়কার জনপ্রিয় লোকখাদ্য ‘কাজী শিন্নি’ তেমনই এক হারিয়ে যাওয়া খাবার, যার স্বাদ, গন্ধ, আর শৈশবের স্মৃতিগুলো আজও মনকে আলোড়িত করে। এই শিন্নির সুগন্ধে একসময় গ্রামের উঠোন, রান্নাঘর, এবং পারিবারিক আঙিনাগুলো ভরে থাকত, কিন্তু আজ তা শুধুই নস্টালজিয়ার গল্প।
আমাদের ছোটবেলায়, বিশেষত আশির দশকে, দাদা-দাদীরা যখন এই শিন্নি তৈরির প্রক্রিয়া শেখাতেন, তখন রান্নার পদ্ধতি ছিল বেশ ব্যতিক্রমী। আধুনিক রান্নাঘরের ঝাঁ চকচকে চুলা নয়, মাটির চুলার পাশে ছোট্ট এক বিশেষ জায়গা করা হতো, যেখানে একটি মাটির হাঁড়িতে চাল সংরক্ষণ করা হতো।
প্রতিদিন রান্নার সময় ধোয়া চাল থেকে সামান্য অংশ ঐ হাঁড়িতে রাখা হতো, আর ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রাখা হতো ছয়দিন ধরে। সপ্তম দিনে যখন সেই চাল রান্না করা হতো, তখন এর গন্ধে যেন এক অনন্য ঐতিহ্যের অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ত পুরো বাড়ি জুড়ে।
কাজী শিন্নির স্বাদ ছিল কিছুটা টক, আবার মসলা-তরকারির সংমিশ্রণে এক অদ্ভুত মাধুর্যতা। পেঁয়াজ, রসুন, তেজপাতা, আর দেশীয় মসলা যোগ করে রান্না করা এই খাবার গ্রামের মানুষের কাছে বিশেষ এক আকর্ষণ ছিল।
বড়রা যেমন এটি খেয়ে তৃপ্তি পেতেন, তেমনি আমাদের মতো ছোটরাও একরকম কৌতূহল নিয়ে খেতে বসতাম। যদিও খাওয়ার পর অনেকে বলত, “কাজী শিন্নির গন্ধে পেট ব্যথা করে,” তবুও শৈশবের ঐ খাবারের জন্য মন আজও কেমন যেন আনমনা হয়ে যায়।
তবে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে অনেক কিছুই বদলে গেছে।
যখন আধুনিক বিজ্ঞান আর স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রসার ঘটল, তখন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা জানালেন, দীর্ঘদিন ধরে ভিজিয়ে রাখা চালে ক্ষতিকর জীবাণুর জন্ম হতে পারে, যা দেহের জন্য ক্ষতিকর। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে এই বিষয়টি নিয়ে প্রচারণা চালালেন, আর ধীরে ধীরে ‘কাজী শিন্নি’ রান্নার সংস্কৃতি কমতে শুরু করল।
একসময় দেখা গেল, কেউ আর সেই বিশেষ মাটির হাঁড়ি ব্যবহার করছে না, আর রান্নার ঐতিহ্যগত নিয়মাবলীও হারিয়ে যেতে বসেছে।
আমাদের ছোটবেলার সেই আনন্দ, সেই রান্নার ঘ্রাণ, আর পাড়া-প্রতিবেশীর সাথে কাজী শিন্নি খাওয়ার স্মৃতি আজ কেবল মনের গভীরে এক অমূল্য সম্পদ হয়ে রয়ে গেছে। এখন যদি গ্রামের কোথাও গিয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করা হয়, “আপনি কি কাজী শিন্নি খেয়েছেন?”—তবে হয়তো অনেকেই বিস্মিত হয়ে বলবে, “ওটা আবার কী?” অথচ আমাদের শৈশবে এই শিন্নির নাম শুনলেই মনে পড়ত,
“ওই বাইত গেছিলাম,
কাজী শিন্নি খাইছিলাম,
কাজী শিন্নির গন্ধে,
পেট ব্যথা করে, পেট ব্যথা করে।”
শুধু কি পেট ব্যথা? না, বরং হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের ব্যথা, শৈশবের সোনালি দিনের ব্যথা, হারিয়ে যাওয়া স্বাদের জন্য এক অব্যক্ত হাহাকার! আজকের আধুনিক সমাজে, যেখানে নতুন খাবারের অভ্যস্ততায় পুরনো ঐতিহ্যগুলো ক্রমেই মুছে যাচ্ছে, সেখানে ‘কাজী শিন্নি’ আমাদের শেকড়ের কথা মনে করিয়ে দেয়।
হয়তো স্বাস্থ্যগত কারণে এটি হারিয়ে গেছে, কিন্তু ঐতিহ্যের স্বাদ কখনো হারায় না। তাই মাঝে মাঝে মনে হয়, যদি কোনোভাবে সেই অতীতের স্বাদটুকু ফিরিয়ে আনা যেত, যদি ‘কাজী শিন্নি’র গন্ধ আবার কোনো এক শৈশবের দুপুরে ফিরে আসত! হয়তো তেমনটা আর সম্ভব নয়, কিন্তু স্মৃতির পাতায় সেই স্বাদ, সেই গন্ধ, আর সেই দিনগুলো চিরকাল বেঁচে থাকবে।
লেখক# কবি ,সাহিত্যিক , প্রফেসর