• শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:০০ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে সম্প্রীতি, দেশটা সবার: প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান মেহেন্দিগঞ্জে মন্দিরে মন্দিরে বস্ত্র বিতরণ,সহাবস্থানের বার্তা ১৭ বছরের প্রবাসজীবনের উপার্জনে গড়া বাড়িতেই ঠাঁই নেই মোসারেফের! সম্পদের হিসাব ও বিয়েকে কেন্দ্র করে পারিবারিক বিরোধ, ১৬ লাখ টাকার মামলায় দুই দিন হাজতবাসের দাবি প্রবাসফেরত ব্যক্তির ভোলায় দুর্গোৎসবে ২৯ মন্দিরে ২৯ লাখ টাকা বরাদ্দ দিলেন মন্ত্রী পার্থ ভোলা সরকারি কলেজ : ক্যাম্পাস সাংবাদিকদের ওপর কোনো হস্তক্ষেপ করা হয়নি: জেলা ছাত্রদল চরফ্যাশনের নজরুল নগর ইউপি নির্বাচনে আলোচনায় মোল্লা আসাদুর রহমান রুবেল শাসক নয়, জনসেবক হতে চান তিনি ১১ বছরের সংসার, ৬ মাসের প্রেম! বিয়ের দাবিতে প্রেমিকের বাড়িতে দুই সন্তানের জননী,পরিবারসহ লাপাত্তা ফাহাদ বোরহানউদ্দিনে যানজটে আটকে ফায়ার সার্ভিস, জরুরি সেবা নিয়ে শঙ্কা—প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দৌলতখানে ডোপ টেস্টে গাঁজা শনাক্ত,আটক যুবক মোটরসাইকেল, স্মার্টফোন ও ৩৪ হাজার ১৫০ টাকা জব্দ।  ভোলায় ডিবির অভিযানে জুয়ার আসর থেকে নগদ ২৮ হাজার টাকা উদ্ধার, আটক ৫ বোরহানউদ্দিনে বাটামারা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির সভাপতি নাসিম কাজী

ভোলা জেলার নকশি কাঁথা: লোকসংস্কৃতির এক অনন্য ঐতিহ্য

NEWS ROOM / ১২৬ বার ভিউ
আপডেট : সোমবার, ২৪ মার্চ, ২০২৫




— মোঃ মহিউদ্দিন
বাংলার লোকসংস্কৃতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন হলো নকশি কাঁথা। ভোলা জেলার গ্রামীণ সমাজে নকশি কাঁথা ছিল একসময় নারীদের পরম শখের ও ভালোবাসার শিল্প। কাঁথার প্রতি সূচিকর্মের প্রতিটি ফোঁড়ে যেন বোনা থাকত স্বপ্ন, আবেগ, ভালোবাসা ও সামাজিক ঐতিহ্যের এক অনন্য গল্প। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাঁথা সেলাইয়ের প্রচলন কিছুটা কমে গেলেও, এখনো অনেক পরিবারে এটি পারিবারিক গৌরব হিসেবে টিকে আছে।
নকশি কাঁথা শুধু শীতের প্রয়োজনীয় বস্ত্র নয়; এটি ভালোবাসা, পরিশ্রম ও সৃজনশীলতার প্রতীক। বিশেষত, বাড়িতে কোনো অতিথি এলে বা নববধূকে বরণ করে নেওয়ার সময় আলমিরা থেকে তুলে আনা হতো রঙিন সুতোয় সেলাই করা একখানি নকশি কাঁথা।
এটি শুধু অতিথির জন্য শীতল আশ্রয় ছিল না, বরং ছিল আতিথেয়তার নিদর্শন, ছিল পরিবারিক ঐতিহ্যের এক মূল্যবান অংশ।
নকশার বহুমাত্রিক রূপ—-
ভোলা জেলার নকশি কাঁথার নকশা ছিল বৈচিত্র্যময়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নারীরা কাঁথার জমিনে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁদের কল্পনার জগৎ। রেশমি সুতা দিয়ে সূক্ষ্ম হাতে আঁকা হতো লতা-পাতা, আঙুরের থোকা, গোলাপ ফুল, চাঁদ-তারা, টিয়া, ময়ূর, হাতির ছবি। শুধু প্রকৃতির রূপই নয়, কাঁথার আঁচলে ধরা থাকত মনের কথা, আবেগের ভাষা।
অনেক নকশি কাঁথার মাঝে দেখা যেত চমৎকারভাবে সূচিকর্ম করা পংক্তি—
“যাও পাখি বল তারে, সেজন্য ভুলে না মোরে।”
“ভুলোনা আমায়”—
এই ধরনের লেখা কাঁথার সৌন্দর্য শুধু বাড়াতো না, বরং তাকে এক আবেগী সত্তায় পরিণত করত। সেই সঙ্গে ধর্মীয় বাণী, প্রেমের ছন্দ, জীবনবোধের নানা বার্তা ও পরিবারের সদস্যদের নামও সূচিকর্মে তুলে ধরার প্রচলন ছিল।
নারীর হাতের গুণ ও সামাজিক মর্যাদা—–
ভোলা জেলার কন্যারা যখন বিয়ের উপযুক্ত হতো, তখন তাদের দক্ষতা যাচাইয়ের অন্যতম মাপকাঠি ছিল সূচিকর্মে পারদর্শিতা। মেয়েদের তৈরি নকশি কাঁথা ও অন্যান্য কারুকার্য দেখে বরপক্ষের লোকজন অভিভূত হতেন। অনেকসময় মেয়ের হাতে করা সূক্ষ্ম সূচিকর্ম দেখেই বলতেন—
“এ মেয়ে গুণবতী, এ আমাদের ঘরের লক্ষ্মী হবে।”
তাদের সেলাই-করা কাঁথা, ঝালর দেওয়া হাতপাখা, আয়নার ফ্রেমের নকশা কিংবা পর্দার কারুকাজ ছিল শুধু অলঙ্কার নয়, বরং এক নারীর শিল্পসত্তার প্রকাশ। কন্যারা সাদা কাপড়ের উপর রেশমি সুতা দিয়ে এমন সব সূক্ষ্ম কাজ করতেন যে সেগুলো ঘরের শোভা বাড়ানোর জন্য আয়নার ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখা হতো যা দেয়ালে ঝোলানো হতো।
হাতপাখা ও নকশার গল্প—-
ভোলা জেলার নারীরা শুধু নকশি কাঁথা নয়, কাপড়ের ছোট্ট পরিসরে রঙিন সুতার কাজ করে ঝালর দেওয়া হাতপাখাও তৈরি করতেন। গরমের দিনে সেই পাখার বাতাস যেমন দেহকে প্রশান্তি দিত, তেমনি সূচিকর্মের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা ফুল, ফল, পাখির নকশা মনকে এক অন্য জগতে নিয়ে যেত। হাতপাখার গায়ে লেখা থাকত স্মৃতিময় ছন্দ—
“জাতের মেয়ে কালোও ভালো, নদীর জল ঘোলাও ভালো।”—-
শুধু সৌন্দর্য নয়, এই হাতপাখাগুলো হয়ে উঠত অনুভূতির বাহক। যখন কেউ ভালোবাসার মানুষের জন্য অপেক্ষায় থাকত, তখন হাতপাখার গায়ে লেখা ছন্দ মনে করিয়ে দিত তাঁর আবেগের কথা।
একটি কাঁথার গল্প—কল্পনার বুনন—
যখন রাত গভীর হতো, তখন ক্লান্ত শরীর বিছানায় লুটিয়ে পড়ত একখানি নকশি কাঁথার নীচে। সূক্ষ্ম সূচিকর্মে আঁকা ফুলের বাগানে হারিয়ে যেত মানুষ। অনেক মেয়ে তাদের কাঁথার কোণে নিজের নাম লিখে রাখত, যেন তা শুধু একটি শিল্পকর্ম না হয়ে ওঠে তাদের অস্তিত্বের স্মারক।
নকশি কাঁথার প্রতিটি সেলাই যেন একেকটি গল্প বলত—কখনো ভালোবাসার, কখনো অপেক্ষার, কখনো বা নিঃসঙ্গতার।
শেষ কথা—-
ভোলা জেলার নকশি কাঁথা শুধুই কাপড়ের টুকরো নয়, এটি এক বিস্তৃত সাংস্কৃতিক ইতিহাসের ধারক। একসময় গ্রামের নারীদের অবসর সময়ের সঙ্গী ছিল এই কাঁথা। এখন আধুনিকতার ঢেউয়ে সেই সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে বসেছে, তবে কিছু পরিবার এখনো এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে ভালোবাসার টানে।
ভোলার মায়েরা, দাদিরা, নানিরা একসময় ভালোবাসা আর আবেগ দিয়ে সেলাই করেছেন নকশি কাঁথা, যা শুধু শীত নিবারণের নয়, বরং ঐতিহ্যের সাক্ষ্য। আজও যদি আমরা এই সংস্কৃতিকে লালন করতে পারি, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পারব ভোলার অতীতের উজ্জ্বল এক অধ্যায়।
নকশি কাঁথা বাঁচলে, বাঁচবে আমাদের শেকড়, আমাদের গল্প, আমাদের নিজস্বতা।
লেখক# কবি ,সাহিত্যিক , প্রফেসর


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরও নিউজ

সর্বশেষ খবর

ক্যাটাগরি