আশিকুর রহমান শান্ত ভোলা জেলা প্রতিনিধিঃ
উজানের পানির চাপে ভোলার তেঁতুলিয়া নদীর তীব্র ভাঙন শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে বিলীন হয়ে গেছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ঘরবাড়ি,ফসলি জমি’সহ বিভিন্ন স্থাপনা। হুমকির মুখে পড়েছে মাছ ঘাট, শত শত ঘরবাড়ি,বাজার ও মসজিদসহ বহু মাছের ঘের। এতেকরে অসহায় হয়ে পড়েছে নদী পাড়ের মানুষ।
চারদিকে যখন ঈদের আনন্দ, ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ। কিন্তু ভোলার ভেলুমিয়া ইউনিয়নের কয়েক হাজার পরিবারের সদস্যদের চোখে ঘুম নেই, মনে নেই শান্তি, নেই ঈদ উৎসবের কোন আমেজ। উৎসবের রঙ এখানে ফিকে হয়ে গেছে তেঁতুলিয়া নদীর আগ্রাসী ভঙ্গনের ফলে। তেঁতুলিয়া নদীর তীব্র ভাঙ্গনে ভিটেমাটি হারানোর হাহাকারে হারিয়ে গেছে এখানের ঈদের আনন্দ।
সোমবার (২৩ মাচ) সকাল ১১ টায় ব্লক দিয়ে নদী ভাঙ্গন স্থায়ীভাবে বন্ধ করার দাবিতে স্থানীয় বাসিন্দারা মানববন্ধনের আয়োজন করেন। ভেলুমিয়ার বিশ্ব রোডের মাথা এলাকায় অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে জড়ো হন শত শত মানুষ। তাদের দাবি একটাই—’আমাদের ভিটেমাটি রক্ষা করুন’। বিশ্ব রোডের মাথা থেকে শরিফ খাঁ বাড়ির চতলা খাল পর্যন্ত প্রায় ৩ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে চলছে এই তাণ্ডব। বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটা আর সাজানো সংসার।
ভেলুমিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হাসনাইন আহমেদ ও ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডাক্তার মহিউদ্দিন সহ স্থানীয়রা বলেন, আমাদের এই জনপদ আজ নদীগর্ভে বিলীন হতে চলেছে। অবিলম্বে সরকারি উদ্যোগে স্থায়ী সমাধান না করলে হাজার হাজার মানুষ ঠিকানা হারাবে। সরকারের কাছে আমাদের জোর দাবি, দ্রুত ব্লক বা জিও ব্যাগ ডাম্পিং শুরু করুন। তা না হলে মানচিত্র থেকে ভেলুমিয়া হারিয়ে যাবে।
স্থানীয় ৫ ও ৯ নং ওয়ার্ডের অবস্থা সবচেয়ে ভয়াবহ। প্রায় ১৩শ পরিবার এখন ঘর হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে। অনেকের সাজানো উঠান এখন নদীর তলে। মাথা গোঁজার শেষ সম্বলটুকু রক্ষায় সরকারের কার্যকর হস্তক্ষেপের অপেক্ষায় হাজারো বিপন্ন মানুষ।
ভোলা প্রেসক্লাবের সাবেক সহ-সভাপতি দৈনিক কালবেলা পত্রিকার ভোলা জেলা প্রতিনিধি ওমর ফারুক বলেন, ভাঙন বন্ধে স্থায়ী পদ্ধতি হচ্ছে-নদী শাসন করে প্রকল্প গ্রহণ করা। এ ধরনের প্রকল্পের মাধ্যমে পদ্মা ও যমুনা’সহ বিভিন্ন সেতু এলাকার ভাঙন বন্ধের নজির রয়েছে। কিন্তু ভোলায় নদী শাসনের মতো তেমন প্রকল্প নেই। আছে শুধু জিও ব্যাগ ডাম্পিং এবং সি.সি.ব্লক দ্বারা নদী তীর আচ্ছাদিত করার মতো অস্থায়ী প্রকল্পই বার বার নেয়া হচ্ছে।
আবার এ ভাঙনের মধ্য দিয়ে ভোলার দুই পাশ থেকে (মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর) বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ড্রেজার দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণে ভোলার ইলিশা, রাজাপুর, কাচিয়া, ভেলুমিয়া, ভেদুরিয়া, মাঝেরচর, মদনপুর এবং শিবপুর ইউনিয়নে ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে এসব এলাকাগুলোতে ঘর-বাড়ি, রাস্তাঘাট ও ফসলি জমি হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে কয়েক লক্ষাধিক মানুষ।
সাংবাদিক মিলি সিকদার বলেন, ভাঙনের ধারাবাহিকতায় দ্বীপজেলা ভোলার মানচিত্র থেকে গত ৫০ বছরে ২৫৭ বর্গকিলোমিটার জনপদ হারিয়ে গেছে। ফলে ভাঙাগড়ার খেলায় ছোট হয়ে আসছে ভোলা, বদলে যাচ্ছে দৃশ্যপট। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত কি পরিমাণ মানুষ যে নদী ভাঙনের শিকার হয়ে নিঃস্ব হয়েছে তার কোন তালিকা নেই স্থানীয় প্রশাসন কিংবা পাউবোর কাছে।
পাউবো সূত্র জানায় , ৩ হাজার ৪৪৮ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ভোলা থেকে গত ৫০ বছরে ২৫৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকা মেঘনা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। প্রতি বছরই ভেঙে যাচ্ছে ১ থেকে ২ বর্গকিলোমিটার এলাকা। যদিও ভাঙন বন্ধে গৃহীত হচ্ছে ছোট-বড় স্বল্প ও দীর্ঘ মেয়াদি প্রকল্প কিন্তু তাতে আশানুরূপ ফল মিলছে না।
জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড ডিভিশন-১ এর ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. হাসানুজ্জামান এর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ এর চেষ্টা করা হলে ও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।