বিজয় বাইন ভোলা প্রকাশঃ
ভোলা “র” বোরহানউদ্দিন পার্বতীয় হাওলাদার বাড়ি পৌর ৪ নং ওয়ার্ড নমকান্দি প্রতি বছরের ন্যায় এ বছরের আয়োজন নিমন্ত্রণ জানিয়েছেন মন্দির কমিটির সদস্যবৃন্দ।
কার্তিক পূজা হিন্দুদের একটি পুজো। কার্তিক হল হিন্দু যুদ্ধদেবতা।দেবাদিদেব মহাদেব শিব ও দশভুজা দুর্গার আদরের ছোট পুত্রকার্তিক।গণেশ তাঁর দাদা।
তবে কোনও কোনও পুরাণে কার্তিককে বড় এবং গণেশকে ছোট পুত্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব নিয়ে নানা মতপার্থক্যও আছে। কার্তিক বৈদিক দেবতা নন; তিনি পৌরাণিকদেবতা।
প্রাচীন ভারতে সর্বত্র কার্তিক পূজা প্রচলিত ছিল। উত্তর ভারতে ইনি এক প্রাচীন দেবতা রূপে পরিচিত। অন্যান্য হিন্দু দেবদেবীর মতো কার্তিকও একাধিক নামে অভিহিত হন। যেমন কৃত্তিকাসুত, আম্বিকেয়, নমুচি, স্কন্দ, শিখিধ্বজ, অগ্নিজ, বাহুলেয়,ক্রৌঞ্চারতি, শরজ, তারকারি, শক্তিপাণি, বিশাখ, ষড়ানন,গুহ,ষান্মাতুর, কুমার, সৌরসেন, দেবসেনাপতি ইত্যাদি। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় দক্ষিণ ভারতে কার্তিকের পূজা অধিক জনপ্রিয়।
তামিল ও মালয়ালম ভাষায় কার্তিক মুরুগান বা মায়ূরী কন্দসামী নামে এবং কন্নড় ও তেলুগু ভাষায় তিনি সুব্রহ্মণ্যম নামে পরিচিত।
তামিল বিশ্বাস অনুযায়ী মুরুগান তামিলদেশের (তামিলনাড়ু) রক্ষাকর্তা।দক্ষিণ ভারত, সিঙ্গাপুর, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও মরিশাস যেখানে যেখানে তামিল জাতিগোষ্ঠীর প্রভাব বিদ্যমান সেখানেই মুরুগানের পূজা অর্থাৎ আমাদের কার্তিক পূজা প্রচলিত। শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাংশে কার্তিকেয়ের উদ্দেশ্যে উৎসর্গিত কথারাগম (সিংহলি ভাষায়”কথারাগম দেবালয়”) মন্দিরে হিন্দু ও বৌদ্ধ উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। বাংলায় কার্তিক সংক্রান্তির দিন বা সেই সময়ে কার্তিক পূজার আয়োজন করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার চুঁচুড়া-বাঁশবেড়িয়া কাটোয়া ও আরও অনেক পার্শবর্তী অঞ্চলে কার্তিক পূজা বিশেষ প্রসিদ্ধ। এছাড়া বাংলার গণিকা সমাজে কার্তিক পূজা বিশেষ জনপ্রিয়। দুর্গাপূজা সময়ও কার্তিকের পূজা করা হয়। কথায় বলে বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ। সারা বছর ধরেই নানারকমের ধর্মীয় এবং সামাজিক অনুষ্ঠান লেগেই রয়েছে। আমরা অনেক পূজা সম্পর্কে ভাল করে জানি না। মহাকবি কালিদাস তাঁর’কুমারসম্ভব’ কাব্যে ‘কুমার’ তথা কার্তিকের জন্মের পূর্বকথা আলোচনা করেছেন।কেউ তাঁকে বলে স্কন্দ, কেউ বলে মুরুগন আবার কেউ ডাকে সুব্রহ্মণ্য বলে। তিনি আসলে দেব সেনাপতি, যুদ্ধের দেবতা।
আমাদের কাছে জনপ্রিয় কার্তিকেয় বা কার্তিক নামে, শিব ও পার্বতীর পুত্র রূপে। দেবলোকে যেখানেই যুদ্ধ হয় সেখানেই কার্তিকের ডাক পড়ে। পুরাণ অনুসারে হলুদবর্ণের কার্তিকের ছটি মাথা। তাই তাঁর অপর নাম ষড়ানন। যুদ্ধের দেবতা বলে নাকি তাঁর ছটি মাথা। চারিদিক থেকে তাঁর লক্ষ্য অবিচল। পাঁচটি ইন্দ্রিয় অর্থাত চোখ, কান, নাক, জিভ ও ত্বক ছাড়াও একাগ্র মন দিয়ে তিনি যুদ্ধ করেন।। তাঁর হাতে থাকে বর্শা-তীর- ধনুক। আবার কারো মতে মানব জীবনের ষড়রিপু- কাম (কামনা), ক্রোধ (রাগ), লোভ (লালসা), মদ (অহং), মোহ (আবেগ), মাত্পর্য্য (ঈর্ষা) কে সংবরণ করে দেব সেনাপতি কার্তিক যুদ্ধক্ষেত্রে সদা সজাগ থাকেন। এই ষড়রিপু মানুষের জীবনের অগ্রগতির বাধা তাই জীবনযুদ্ধে জয়লাভ করতে গেলেও কার্তিকের মত সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে। পুরাণমতে তিনি তরুণ সদৃশ, সুকুমার, শক্তিধর এবং সর্বসৈন্যের পুরোভাগে অবস্থান করে। তাই মা দূর্গার যুদ্ধযাত্রায় সময় এমন শৌর্যবীর্য সম্পন্ন পুত্র সঙ্গে রাখেন। কোনো কোনো মতে রণ- দেবতা কার্তিক হলেন চিরকুমার ব্রহ্মচারী। আবার কোনো কোনো পুরাণ মতে কার্তিকের পত্নী হলেন ইন্দ্রের কন্যা দেবসেনা বা লক্ষ্মীরূপিণী ষষ্ঠী।
আধুনিক বাঙালিদের মধ্যে কার্তিক ঠাকুর পুজো নিয়ে খুব বেশি হইহুল্লোড় হয় না। দুর্গাপুজোর পরেপরেই কিছুদিনের মধ্যেই কার্তিকমাসের সংক্রান্তিতে হয় কার্তিকের পুজো। কোন কোন প্রাচীন পরিবারে ধারাবাহিকভাবে, এবং এক-দুটি বিশেষ অঞ্চলে খুব হইচই করে এই পুজো হয়; কিন্তু সর্বজনীন পুজো হিসাবে কার্তিকপুজো বাঙালি সমাজে এখন আর সেরকম জনপ্রিয় নয়। সেই কমে আসা উৎসাহ থেকেই সম্ভবতঃ মুখে মুখে তৈরি হয়েছে এই ছড়া-
“কার্তিক ঠাকুর হ্যাংলা,
একবার আসেন মায়ের সাথে,একবার আসেন একলা।”
এটা কিন্তু খুব অন্যায়। একলা কার্তিকই খালি দুবার আসেন নাকি?
মা-দুর্গার বাকি ছেলেমেয়েরাও কি আলাদা করে আরেকবার আসেন না?হ্যা আসেন তো।সরস্বতী, গনেশ ও লক্ষী এরা সবাই তো আলাদা আলাদা করেও আসেন।