• মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৩ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম
বিশ্ব শিক্ষক দিবস:মনপুরার বসির আহাম্মেদ যেভাবে হলেন পুরো উপজেলার ‘বসির মাস্টার’ ছয় বছর আত্মগোপনে থেকেও শেষ রক্ষা হলো না,ভোলায় যাবজ্জীবন সাজা/প্রাপ্ত আসামি গ্রেফতার। ভোলায় ৪০ পিস ইয়াবাসহ দুইজন আটক,পৃথক দুটি মামলা শেষ রজনীতে মহামায়ার বিদায়ী বার্তা—‘আবার ফিরবো,সমাজের বিভাজনকে চ্যালেঞ্জ করবো’ ভেলুমিয়ার বাঁধের পাড়ে ভোলায় চালু হচ্ছে কায়াকিং পয়েন্ট ভোলায় অনলাইন জুয়া চক্রের সদস্য গ্রেপ্তার, সতর্ক করল পুলিশ ভোলায় বৃদ্ধ বাবাকে গলায় চাপ দিয়ে হত্যা’চেষ্টার অভিযোগ, ছেলে গ্রেপ্তার বোরহানউদ্দিনে জমি দখল ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ বোরহানউদ্দিনে ইয়াবাসহ গ্রেফতার এক,২০ পিস ইয়াবা,নগদ টাকা ও মোবাইল ফোন উদ্ধার দৌলতখানের চাঞ্চল্যকর হ’ত্যা মামলায় গ্রেফতার ২

বিশ্ব শিক্ষক দিবস:মনপুরার বসির আহাম্মেদ যেভাবে হলেন পুরো উপজেলার ‘বসির মাস্টার’

NEWS ROOM / ২৩ বার ভিউ
আপডেট : সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬




পাঁচ দশক আগের কথা। ভোলা জেলার বিচ্ছিন্ন ও নদীঘেরা উপজেলা মনপুরা উপজেলা । চারিদিকে মেঘনার উত্তাল তরঙ্গ আর দুর্গম যাতায়াত ব্যবস্থার কারণে তৎকালীন সময়ে এ অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছিল বেশ ধোঁয়াশাচ্ছন্ন। চরাঞ্চলের অধিকাংশ পরিবারে অভাব-অনটনের সংসার চলায় সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর চেয়ে ক্ষেত-খামারে বা নদীতে মাছ ধরার কাজে পাঠাতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন অভিভাবকেরা।

​সেই ঘোর অন্ধকার ও প্রতিকূল সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে শিক্ষার আলো ছড়ানোর কঠিন ব্রত নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন এক অদম্য তরুণ। নাম তাঁর মো. বসির আহাম্মেদ। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকতা ও সমাজসেবার মাধ্যমে সেই সাধারণ ‘বসির আহাম্মেদ’ আজ পুরো মনপুরা উপজেলার মানুষের কাছে এক নামে শ্রদ্ধেয়—‘বসির মাস্টার’।

​আজ ৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এই বিশেষ দিনে মনপুরার চরফৈজুদ্দিন গ্রামের ঐতিহ্যবাহী ‘মাস্টার পরিবারে’র জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব বসির মাস্টারের জীবন-সংগ্রাম ও শিক্ষার আলো ছড়ানোর মহতি গল্পটি নতুন করে অনুপ্রাণিত করছে সবাইকে।
​
​১৯৬০ সালের ৩১ ডিসেম্বর তজুমদ্দিন উপজেলার সোনাপুর ইউনিয়নের চণ্ডীপুর গ্রামের জন্ম গ্রহণ করেন বসির আহাম্মেদ । পরে তারা সপরিবারে মনপুরায় চলে আসেন। শৈশব থেকেই শিক্ষার প্রতি ছিল তাঁর এক অনন্য অনুরাগ। ১৯৮১ সালে তিনি রহমানিয়া ইবতেদায়ী মাদ্রাসায় বাংলা বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে তিনি তৎকালীন ফৈজুদ্দিন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বাংলা শিক্ষক পদে যোগদান করেন। দীর্ঘ ও সফল কর্মজীবন শেষে এ বিদ্যালয় থেকেই তিনি অবসর গ্রহণ করেন।

​শিক্ষকতার শুরুর দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে স্থানীয় বয়োজ্যেষ্ঠ মো. সাদেক হোসেন জানান, বসির মাস্টারের শিক্ষকতা কেবল বিদ্যালয়ের চার দেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ ছিল না। কোমলমতি শিশুদের বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনতে এবং অভিভাবকদের শিক্ষার গুরুত্ব বোঝাতে তিনি নিজে গ্রামে গ্রামে, বাড়ি বাড়ি হেঁটে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী সংগ্রহ করে পড়াতেন । সহজ-সরল ভাষায় বাংলা পাঠদান এবং শিক্ষার্থীদের প্রতি পিতৃসুলভ ভালোবাসাই তাঁকে একসময় শিক্ষার্থীদের প্রাণের ‘বসির মাস্টার’ হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
​
শিক্ষার প্রতি এই পরিবারের অনুরাগ ও আত্মত্যাগ পুরো উপজেলায় এক বিরল দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। তাঁরা পাঁচ ভাইয়ের অধিকাংশেরই কর্মজীবন কেটেছে শিক্ষকতা পেশায়।

​উপকূলীয় চরাঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়াতে এক পরিবারের একাধিক সদস্যের এমন সার্বিক অংশগ্রহণের কারণে পুরো মনপুরা উপজেলা জুড়েই তাঁদের বাড়িটি ‘মাস্টার পরিবার’ নামেই পরিচিতি লাভ করে।

​পারিবারিক জীবনে তাঁর স্ত্রী আলেয়া বেগম একজন নিবেদিতপ্রাণ গৃহিণী, যিনি প্রতি পদে বসির মাস্টারকে সমাজসেবামূলক কাজে মানসিক শক্তি ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। তাঁদের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে মনির আহাম্মেদ স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত এবং ছোট ছেলে মেসকাত আহাম্মেদ পেশায় একজন সাংবাদিক। বাবার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁরাও নিজ নিজ স্থান থেকে রাষ্ট্রের সেবায় নিয়োজিত আছেন।
​
​একজন শিক্ষকের আসল সফলতা লুকিয়ে থাকে তাঁর শিক্ষার্থীদের সফলতায়। চার দশকের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে বসির মাস্টারের হাত ধরে তৈরি হয়েছে হাজারো আলোকিত মানুষ। তাঁর পড়ানো অসংখ্য শিক্ষার্থী আজ দেশের স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে ডাক্তার, আইনজীবী, প্রকৌশলী ও শিক্ষকসহ নানা দায়িত্বশীল পদে থেকে সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখছেন।

​শিক্ষকতা জীবন থেকে অবসরে যাওয়ার পরও অবহেলিত চরাঞ্চলের মানুষের সেবা করা থেকে নিজেকে দূরে রাখেননি তিনি। এলাকার মানুষের অগাধ ভালোবাসা ও দাবির মুখে তিনি ২নং হাজিরহাট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য (মেম্বার) নির্বাচিত হন। শিক্ষক হিসেবে যেভাবে মানুষের আস্থা অর্জন করেছিলেন, মেম্বার হয়েও একইভাবে স্বচ্ছতা ও নিষ্ঠার সাথে জনসেবা পরিচালনা করেন।
​
​বিশ্ব শিক্ষক দিবসে মনপুরা উপজেলার সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছেন এই আলোকবর্তিকাকে। চরাঞ্চলের মতো দুর্গম এলাকায় শিক্ষার যে বীজ তিনি রোপণ করেছিলেন, তা আজ এক প্রকাণ্ড মহীরুহে পরিণত হয়েছে।
​বসির আহাম্মেদ কেবল একজন ব্যক্তির নাম নয়; ‘বসির মাস্টার’ নামটি মনপুরার শিক্ষাবৃত্তে এক বিশ্বাস, আস্থা ও উদ্দীপনার প্রতীক।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরও নিউজ

ক্যাটাগরি