বিজয় বাইন ভোলা প্রকাশঃপ্রিন্সিপাল এম ফারুকুর রহমানের ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক পর্যালোচনা
প্রিন্সিপাল এম ফারুকুর রহমানের লেখাটি শুধু মাকে নিয়ে আবেগঘন স্মৃতিচারণ নয়; এটি এক গভীর সামাজিক বোধ থেকে জন্ম নেওয়া মানবিক আহ্বান। ২০০৬ সালে একটি সংবাদপত্রে মায়ের ওপর সন্তানের নির্মম নির্যাতনের খবর পড়ে তিনি যে ব্যথিত হয়েছিলেন, তা ব্যক্তিগত অনুভূতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেই আঘাত থেকেই তিনি একটি সহজ কিন্তু শক্তিশালী স্লোগান বেছে নেন: “আমার মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নারী।”
এই স্লোগানের শক্তি তার সরলতায়। এটি কোনো জটিল তত্ত্ব নয়, কোনো বড় প্রতিষ্ঠানিক কর্মসূচিও নয়। একজন সাধারণ শিক্ষক নিজের সীমাবদ্ধতা জেনেও সমাজে নৈতিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। এখানেই লেখাটির সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। অনেক সময় বড় পরিবর্তনের শুরু হয় ছোট, আন্তরিক, পুনরাবৃত্ত একটি বাক্য থেকে। তিনি সেটিই করেছেন।
লেখাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মায়ের প্রতি সম্মান শুধু মা দিবসের আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি প্রতিদিনের আচরণ, দায়িত্ববোধ, যত্ন এবং কৃতজ্ঞতার বিষয়। যে মা সন্তানকে গর্ভে ধারণ করেন, অভাব-অনটন, কষ্ট, অপমান, সংগ্রাম পেরিয়ে বড় করেন, সেই মায়ের প্রতি অবহেলা বা নির্যাতন শুধু পারিবারিক অপরাধ নয়; এটি সমাজের নৈতিক ব্যর্থতা।
তবে ইতিবাচক সমালোচনার জায়গা থেকে বলা যায়, “মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নারী” কথাটি অত্যন্ত সুন্দর হলেও এর সঙ্গে বাস্তব দায়িত্বের কথাও আরও জোর দিয়ে যুক্ত হওয়া দরকার। মাকে ভালোবাসি বলা সহজ; কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে তাঁর চিকিৎসা, নিরাপত্তা, মানসিক সঙ্গ, সম্পত্তির অধিকার, মর্যাদাপূর্ণ জীবন এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অনেক বেশি জরুরি। কেবল আবেগ নয়, মায়ের প্রতি সম্মানকে পারিবারিক দায়িত্ব ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন হিসেবেও দেখা দরকার।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব মায়ের জীবন এক রকম নয়। কেউ দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়েছেন, কেউ একা সন্তান বড় করেছেন, কেউ নির্যাতন সহ্য করেছেন, কেউ নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন। তাই মাকে সম্মান করার অর্থ শুধু তাঁকে মহিমান্বিত করা নয়; তাঁর বাস্তব কষ্ট, শ্রম, অধিকার ও ব্যক্তিসত্তাকেও স্বীকৃতি দেওয়া।
প্রিন্সিপাল ফারুকুর রহমানের উদ্যোগের সবচেয়ে বড় মূল্য এখানেই যে তিনি নীরব থাকেননি। তিনি দেখেছেন, ব্যথিত হয়েছেন এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী একটি নৈতিক আন্দোলন শুরু করেছেন। ২০০৬ সাল থেকে আজ পর্যন্ত একটি স্লোগান প্রচার করে যাওয়া সহজ কাজ নয়। এতে ধৈর্য, বিশ্বাস ও মানবিক দায়বদ্ধতা লাগে।
সব মিলিয়ে, তাঁর স্লোগান আমাদের পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সমাজে নতুন করে উচ্চারিত হওয়া দরকার। তবে সেই উচ্চারণ যেন শুধু কথায় না থাকে। তা যেন আচরণে, যত্নে, দায়িত্বে এবং মায়ের মর্যাদা রক্ষার বাস্তব উদ্যোগে প্রকাশ পায়।
আমার মা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নারী, এই বিশ্বাস তখনই সত্য হবে, যখন আমরা মাকে শুধু ভালোবাসব না, তাঁর পাশে দায়িত্ব নিয়েও দাঁড়াব।