অনিন্দ্য মন্ডল।।
সেদিন ছিল শনিবার।বৈশাখ মাস,তাই যখন তখন ঝড়ো বাতাস বইতে থাকে।
যেহেতু শুক্র,শনি এই দুই দিন সরকারি ভাবে বন্ধ থাকে।তাই ছুটির দিনে সাধারণত হাতে কোন কাজ থাকে না আমার।ঘরে শুয়ে বসে দিন কাটাই।রবিবার থেকে কলেজ খোলা অতএব আজ শনিবার কোন চাপ নেই।ঘরের বারান্দায় চেয়ারে বসে ফেসবুকে স্ক্রল করছি এমন সময় আসিফ এলো।আসিফ আমার বাল্যকালের বন্ধু।আমরা একসাথে প্রাইমারি,মাধ্যমিক শেষ করেছি।কিন্তু মাধ্যমিক পরীক্ষার পর পরই সে ঢাকায় চলে যায় চাকরির উদ্দেশ্যে।
আসিফ যদিও ছাত্র।কিন্তু পেটের তাগিদে ঢাকায় একটা গার্মেন্টসে চাকরি করে।পড়াশোনার সময়ই পায় না।
আসিফ আমায় দেখে বলল,কিরে নিরব এখানে একা বসে বসে কি করছিস ?
আমি আসিফের দিকে তাকিয়ে বললাম,তুই হঠাৎ,কোথা থেকে আসলি ?আর তুই ঢাকা থেকে আসলিই বা কবে ?
‘আরে আমি তো গতকাল রাতেই ঢাকা থেকে আসছি।রাতে তো তোর সাথে দেখা করা সম্ভব হবে না তাই এখন আসলাম।’
‘তা বেশ করেছিস।তো তোর এখন কি অবস্থা ?’
‘এইতো চলছে।শোন আজ বিকেলে ফুড কর্নারে দেখা করব আমরা দুইজন।ঠিক আছে ?’
‘ভালোই তো চল তাহলে।’
বিকেলে ফুড কর্নারে এসে দেখি অলরেডি আসিফ ওখানে বসে আছে।এরপর খাবার অর্ডার করলাম।তারপর দুই বন্ধু মিলে জমিয়ে আড্ডা দিলাম।মিনিট কুড়ি পর ওয়েটার এসে খাবার দিয়ে গেল।
খেতে খেতে দুই বন্ধু পুরনো দিনের স্মৃতি চারণ করতে লাগলাম।এর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি খেয়াল করলাম বেশ কিছু লোক আমার দিকে অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে আছে।
রেস্টুরেন্ট থেকে বেরোতে বেরোতে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমে যায়।
আমি রাস্তার উপর দাঁড়িয়ে রইলাম আর অপেক্ষা করতে লাগলাম একটা অটো রিক্সা বা সিএনজির।কিছুক্ষণের মধ্যে একটা অটো রিক্সা এসে আমার সামনে দাঁড়ালো।
রিক্সাওয়ালাকে আমার গন্তব্যের ঠিকানা জানাতে রিক্সাওয়ালা ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।
যাইহোক,আমি রিক্সায় চড়ে বসলাম।হঠাৎ দেখি মায়ের ফোন।
মা ফোন করে জানতে চাইলো আমি ঠিক আছি কিনা।কারণ,কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝড় উঠবে।মা আমাকে সাবধানে বাড়ি আসার কথা বলে।আমি এটুকু শুনে ফোনটা রাখতেই যাচ্ছিলাম।এমন সময় মার কথা শুনে আমি প্রায় স্তম্ভিত হয়ে যাই।
মা বলল,আজ সকালের ঢাকা থেকে বরিশাল আসা বাস দূর্ঘটনা হয়,ওই বাসে আসিফও ছিল।
মার কথা শুনে আমি প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে যাই।চোখ বেয়ে কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে পড়ল।আমি যে বিশ্বাসই করতে পারছি না যে আসিফ আর নেই।
কেন যেন আমার চোখের জল বাঁধ মানছে না।কিন্তু তাও নিজেকে আমি শক্ত করে নিলাম।
যাইহোক,রিক্সা চলছে তার গন্তব্যে।আমার বাসায় যাওয়ার পথে একটা কবরস্থান পড়ে।কবরস্থানের কাছাকাছি আসতেই রিক্সাওয়ালা বলল,আর যেতে পারব।এই জায়গাটা ভালো না।
‘কি যে বলেন না মামা।আমি তো প্রায়ই এখান দিয়ে যাতায়াত করি।কই আমার তো কোন সমস্যা হয় না ?’
‘আপনি কি রাতেও এখান দিয়ে যাওয়া আসা করেন ?’
‘না রাতে কখনো করিনি।কিন্তু তাতে কি ?চলুন না।’
‘দেখেন মামা এই জায়গাটা ভালো না।সন্ধ্যার পর এখান দিয়ে কেউ যাওয়া আসা করে না।আমারে মাফ করবেন।’
অগত্যা রিক্সাওয়ালাকে ভাড়া পরিশোধ করে আমি একা একা রাস্তায় হাঁটতে লাগলাম।
আমি যখন কবরস্থানটার কাছাকাছি আসলাম তখন আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল।
অথচ,এরকমটা আগে কখনো ফিল করিনি।
এদিকে বাতাস বাড়তে লাগল।কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝিরিঝিরি করে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো।হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পড়তে শুরু করলো।আর কোন গত্যান্তর না পেয়ে ওই কবরস্থানে ঢুকতে বাধ্য হলাম।কবরস্থানের গেট খোলাই ছিল। কবরখানার গেটের বামপাশে একটা শুকনো মরা অশ্বত্থ গাছ।গাছে একটা পাতা অব্দি অবশিষ্ট নেই।
আমি যখন একবার ওই গাছের দিকে তাকালাম,দেখলাম মনে হলো সাদা রঙের একটা আলখাল্লা পরা এক লোক ওই গাছের এক ডালে বসে আছে।
এই দেখে আমি সাথে সাথে চোখ নামিয়ে ফেলি।কিছুক্ষণ পর আবার আমি ওই গাছের তাকাই।কিন্তু তারপর আমি ওখানে আর কাউকে দেখতে পাই না।
এর কিছুক্ষণ পর আমি আমার ঘাড়ে গরম নিশ্বাসের আওয়াজ পাই।আমি সাথে সাথেই পিছন ফিরে তাকালাম।
এরপর আমি সেখানে যা দেখলাম তা দেখে আমি রীতিমতো চমকে গেলাম।আমি দেখলাম ওই আলখাল্লা পরা লোকটা ঠিক আমার সামনেই।এতোক্ষণ আমার পিছনে ছিল।এবার আমি স্পষ্ট লোকটাকে দেখতে পেলাম।দেখে আমি বেশ অনেকটা ভয় পেয়ে যাই।কারণ,এতোক্ষণ যাকে আমি মানুষ বলে মনে করেছি সেটা আসলে কোন মানুষই না।ওই অদ্ভুত দেখতে জিনিসটার চোখের কোটরে চোখ নেই,গালের অর্ধেক মাংস নেই যেন কোন হিংস্র জন্তু খুবলে নিয়েছে তার গালের মাংস।
আমি আর সেখানে দাঁড়িয়ে না থেকে আস্তে আস্তে পিছোতে লাগলাম।এরপর ওই জন্তুটার থেকে অনেকটা দূরে আসার পর দেখলাম ওই জন্তুটা ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে।এবার ওই জন্তুটা যা করল তা বোধহয় আমি কখনো ভাবতে পারিনি।আমি দেখলাম ওই অদ্ভুত জন্তুটা তার লম্বা লম্বা দুইটা হাত মাটিতে রাখল।এরপর হঠাৎই ওই জন্তুটা হামাগুড়ি দিতে দিতে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল।যা দেখে আমি রীতিমতো আঁতকে উঠি।এরপর ওই জন্তুটা আমার ঠিক কাছে আসতেই যাচ্ছিল।হঠাৎ কোন এক অদৃশ্য শক্তি যেন ওই জন্তুটাকে বাঁধা দিচ্ছিল।ঠিক তখনই কে যেন আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,’তাড়াতাড়ি পালা নিরব।পালা,আমি একে আটকাচ্ছি।’ কন্ঠটা আমার চেনা চেনা লাগল।আমি বুঝতে পারলাম এই কন্ঠটা আর কারোর না আসিফের।আর এক মুহুর্তও দাঁড়ালাম না।এক দৌড়ে গেইটের কাছে চলে আসলাম।গেইটের কাছে এসে দেখলাম গেইটটা খোলাই আছে।বৃষ্টিও তখন থেমে গেছে,আর বিলম্ব নয় এবার সোজা বাসায়।আবার পিছনে তাকিয়ে দেখলাম ওই জন্তুটার সাথে আসিফ এখনো লড়াই করছে।যা দেখে আমার চোখ দিয়ে অজান্তেই জল গড়িয়ে পড়ল।
মনে মনে বললাম,তুই আমার সত্যিকারে প্রাণের বন্ধু আসিফ।মরেও তুই আমাকে বাঁচিয়ে দিলি।
এরপর কোনরকমে রাস্তা পাড় হয়ে আমি আমাদের এলাকায় এসে পৌছালাম।সেখান থেকে সোজা নিজের বাসায়।
পরদিনই আমার গা কাঁপিয়ে জ্বর এলো।ডাক্তার দেখলো এরপর সুস্থও হয়ে গেলাম।একদিন আমি আমাদের এলাকার এক মুরুব্বিকে জিজ্ঞেস করলাম যে আসলে ওই কবরস্থানটা কিসের ?
তো মুরব্বি আমাকে যা জানালো।
ওই কবরস্থানটা নাকি প্রায় ২০/৩০ বছর ধরে বন্ধ।অনেকদিন আগে ওখানে মৃত মানুষদের লাশ দাফন করা হতো।
যা শুনে আমি তো অবাক।তাহলে ওইদিন রাতে আমি যে দেখলাম কবরস্থানের গেইট খোলা।তাহলে সেটা কি ?
সমাপ্ত-