মহিউদ্দিন মহিন ভোলা প্রকাশঃ
আমার শৈশব যেন এক বিস্মৃত স্বর্গের নাম—একটি সময়, যখন জীবন ছিল সহজ, স্বতঃস্ফূর্ত এবং গভীরভাবে বাঙালিয়ানায় রঞ্জিত। আজকের কৃত্রিম আয়োজন, সাজানো উৎসব আর প্রদর্শনীর ভিড়ে দাঁড়িয়ে যখন অতীতের দিকে তাকাই, তখন মনে হয়—আমরা কত স্বাভাবিকভাবে, কত অকপটে বাঙালি ছিলাম!
বৈশাখের আগমনী সুর ও গ্রামীণ উচ্ছ্বাস
পহেলা বৈশাখ আমাদের কাছে ছিল না কোনো ফ্যাশন বা আনুষ্ঠানিক প্রদর্শনের দিন; বরং ছিল এক অদম্য আনন্দের উপলক্ষ। বৈশাখের আগমনের আগেই গ্রামের বাতাসে ভেসে আসত বাঁশির করুণ অথচ মোহনীয় সুর। সেই বাঁশির শব্দে যেন পুরো গ্রাম জেগে উঠত—কখনো কানে ঝালাপালা লাগত, তবু সে সুরেই ছিল আনন্দের এক অদ্ভুত আমন্ত্রণ।
আমরা জানতাম না—লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, গামছা গলায় জড়িয়ে, ইলিশ-পান্তা খেয়ে ‘একদিনের বাঙালি’ হতে হয়। কারণ আমরা ছিলাম সারাবছরের বাঙালি। আমাদের প্রতিটি দিনই ছিল বৈশাখের মতো—স্বাভাবিক, প্রাণবন্ত এবং গ্রামীণ সংস্কৃতির গভীরে প্রোথিত।
পান্তা ভাত: জীবনের স্বাদ ও সরলতার প্রতীক
আমাদের শৈশবে পান্তা ভাত ছিল বিলাসিতা নয়, বরং ছিল দৈনন্দিন জীবনের অংশ। রাতের অবশিষ্ট ভাত মা পানি দিয়ে ভিজিয়ে রাখতেন, আর সকালে ঘুম থেকে উঠে সেই পান্তা ভাত, আগের দিনের ইলিশ মাছের তরকারি কিংবা,যে কোন প্রকার ডালের ভর্তা, লবণ-মরিচ, কাঁচা পেঁয়াজ, বোম্বাই মরিচ অথবা কাঁচা মরিচ দিয়ে খেয়ে খুব ভোরে আমরা মক্তবে যেতাম।
আজকের মতো তাৎক্ষণিক তৈরি পান্তা ভাতের সেই স্বাদ কোথায়! আমাদের পান্তা ছিল সময়ের সঙ্গে মিশে থাকা, মাটির গন্ধমাখা এক নিখাদ খাবার। তাতে ছিল অভাবের ছোঁয়া, কিন্তু তৃপ্তির কোনো অভাব ছিল না।
পোশাকের সরলতা ও পরিচয়ের স্বচ্ছতা
আমাদের পোশাক ছিল আমাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি। সারাদিন লুঙ্গি, গেঞ্জি, গলায় গামছা—এই ছিল আমাদের স্বাভাবিক পরিচয়। নামাজ পড়তে গামছা মাথায় জড়িয়ে নেওয়া, অথবা খালি পায়ে দৌড়ে বেড়ানো—এসবেই ছিল আমাদের স্বাধীনতা।
শুধু স্কুলে যাওয়া, শহরে যাওয়া বা বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সময় আমরা পাঞ্জাবি-পায়জামা কিংবা শার্ট-প্যান্ট পরতাম। অর্থাৎ, আমাদের জীবনেই ছিল দুই সমাজের জন্য দুই রকম পোশাক—কিন্তু তাতে কোনো ভান ছিল না, ছিল প্রয়োজনের স্বাভাবিকতা।
খেলনা, বাজার আর শৈশবের সঞ্চয়
পহেলা বৈশাখ মানেই ছিল জমিয়ে রাখা কয়েনের হিসাব। আমরা নানা উপায়ে অল্প অল্প করে টাকা জমাতাম—শুধু খেলনা কেনার আনন্দে। ভোলা সদরের চকবাজারের মনোহারী পট্টিতে গেলে চোখ ঝলসে যেত রঙিন খেলনার পসরা দেখে।
দোকানিরা বাঁশি বাজিয়ে আমাদের ডাকত, আর আমরা ছুটে যেতাম। মাটির ঘোড়া, গরু, সিংহ, বাঘ, টিয়াপাখি—ছোট ছোট প্রাণী পুতুল, মাটির ব্যাংক, বেতের তৈরি মালা, টিনের বাঁশি,ময়ূরের পালক —এসব ছিল আমাদের স্বপ্নের ভাণ্ডার।
বিশেষ করে টিনের তৈরি লঞ্চ—যার ভেতরে কেরোসিনের ছোট বাতি জ্বালালে তা পানিতে টুপটুপ শব্দ করে চলত—ছিল আমাদের কাছে এক আশ্চর্য আবিষ্কার। পুকুরে সেই লঞ্চ ছেড়ে দিয়ে আমরা আনন্দে মেতে উঠতাম—একসাথে, দল বেঁধে, সীমাহীন উচ্ছ্বাসে।
খাবারের আনন্দ ও ভাগাভাগির সংস্কৃতি
আমাদের সংসারে অতিথি ছিল নিত্যদিনের ব্যাপার। ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন মিলে খাওয়ার সময় যেন এক প্রতিযোগিতা চলত—কে আগে বসবে, কে বেশি পাবে! অনেক সময় তরকারি কম পড়ে যেত, তখন ডাল ভর্তা, পোড়া মরিচ দিয়ে ভাত খেতাম।
তবু সেই ভাগাভাগির মধ্যেই ছিল এক অপার আনন্দ। বড় ইলিশ মাছের ডিম সবাই মিলে ভাগ করে খেতাম—একটু একটু করে, কিন্তু তৃপ্তি ছিল অগাধ।
রান্নাঘরের মাটির মেঝেতে পিঁড়ির উপর বসে একসাথে খাওয়ার যে আনন্দ—তা কোনো আধুনিক ডাইনিং টেবিল দিতে পারে না।
সংরক্ষণ, স্বাদ ও গ্রামীণ ঐশ্বর্য
আমাদের ঘরে সবসময়ই থাকত নুন দেওয়া ইলিশ মাছ—মাটির মটকায় ভরা। খেজুরের গুড়ও ছিল সারাবছরের সঙ্গী। সেই গুড়ের মধ্যে জমে থাকা স্বচ্ছ ‘রোয়া’ ছিল আমার প্রিয় মিঠাই—যাকে আমি ছোটবেলায় বলতাম “চাক্কা মিঠাই”।
পুকুরে ভরা থাকত জিওল মাছ—যখন ইচ্ছে ধরতাম, রান্না করতাম। দেশি চিংড়ি, বুনো শাকসবজি, খোলায় ভাজা মাছ—এসবই ছিল আমাদের খাদ্য তালিকার অংশ। স্বাদ ছিল প্রাকৃতিক, অকৃত্রিম, হৃদয়গ্রাহী।
বর্তমানের কৃত্রিমতা বনাম অতীতের সত্যতা
আজকের পহেলা বৈশাখ যেন এক প্রদর্শনী—পোশাক, খাবার, সাজসজ্জা—সবকিছুতেই কৃত্রিমতার ছাপ। পান্তা-ইলিশ এখন একদিনের আয়োজন, অথচ আমাদের কাছে তা ছিল প্রতিদিনের জীবন।
বর্তমানের সেই তাৎক্ষণিক পান্তা ভাতে নেই মাটির গন্ধ, নেই স্মৃতির আবেশ। তাই আজ এসব অনুষ্ঠানে অংশ নিলেও সেই তৃপ্তি আর ফিরে পাই না।
স্মৃতির গভীরে বাঙালিয়ানা
আমার শৈশব ছিল বাঙালিয়ানার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি—যেখানে ছিল না কোনো ভান, ছিল না কোনো অভিনয়। ছিল কেবল সহজ জীবন, প্রাকৃতিক স্বাদ, এবং আন্তরিক ভালোবাসা।
আজকের প্রজন্ম হয়তো সেই স্বাদ জানে না, সেই আনন্দ অনুভব করে না। কিন্তু আমার হৃদয়ে সেই দিনগুলো এখনো অমলিন—যেন এক চিরসবুজ অধ্যায়, যেখানে ফিরে যেতে মন চায় বারবার।
আমার শৈশব—আমার গর্ব, আমার শিকড়, আমার চিরন্তন বাঙালিয়ানা।